ইতিহাস ঐতিহ্যের দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান ভ্রমণ

মধ্য এশিয়ার চমৎকার দেশ উজবেকিস্তান এ প্রথমে যখন প্রবেশ করবেন তখন আপনার যে বিষয়টা চোখে পড়বে আপনি ইউরোপের কোন দেশে চলে এসেছেন। এখানকার মানুষজনের গঠন ,চারপাশের ভাইব যেমন বাড়ি ঘর রাস্তাঘাট অনেকটাই ইউরোপ ধাঁচের । যদিও উজবেকিস্তানের ৯০% মানুষই মুসলমান অর্থাৎ মুসলিম প্রধান দেশ হলো উজবেকিসত্তান।

উজবেক এর রাজধানী হলো তাশখন্দ। উজবেকিস্তান মুলত সোভিয়ান ইউনিয়নের আন্ডার ছিলো পরে ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে আলাদা হয়ে যায় যদিও এখনো রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রভাব এই অণ্জলে রয়ে গেছে। মোট জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি ৬০ লা্খের মতো। ৮০% এলাকাই হলো সমতল আর বাকীটা পাহাড়ী এলাকা। 

উজবেকিস্তানে যদি ঘুরতে চান তবে কমন বললে তাশখান্দ /সমরখন্দ /বুখারা /খিবএগুলোই এরবাইরে অনেক কিছু আছে তবে সেটা আ্পনার ইন্টারেস্ট ও সময়ের উপরে নির্ভর করে যেমন চিমগান পবর্ত এলাকায় শীতকালে বরফ পাবেন। 


উজবেকের মুদ্রার নাম হলো সুম , ১ ডলার =১২৫০০ সুম পাওয়া যায় ,বাংলা টাকায় হিসাব করলে ১০০ টাকায় ১০০০০ সুম পাবেন।

আমাকে যদি বলেন উজবেকে মুলত মানুষ ঘুরে কি তাহলে আমি বলবো উজবেক হলো ইতিহাস এর শহর। মুল স্পট গুলো সব ইতিহাস নির্ভর স্পট । মধ্য এশিয়ার মধ্যে দিয়ে যে ঐতিহাসিক সিল্ক রুট সেটাও উজবেক হয়ে তাজিকিস্তানে গিয়েছে।১৩৩৬ সালে জন্ম নেয়া ইতিহাস বিখ্যাত তৈমুর লং হলো উজবেকের জাতির পিতা। সমৃদ্ধ হাদীস বর্ণনা কারী ইমাম বুখারী এখানেই জন্মগ্রহণ করেন ও তার কবরও এখানে।

উজবেকিস্তানের মিউজিয়াম ও প্রত্নতত্ব স্পটগুলোতে ২০ লাখের বেশি নির্দশন আছে যা অসংখ্য জনগোষ্টির ইতিহাসকে নির্দশন করে।

৩২৯ সালে বিখ্যাত বীর আলেকজেন্ডার উজবেকিস্তানের সমরখন্দ শহর বিজয় করেছিলেন। সমর খন্দ অণেক পুরাতন শহর খিষ্টপূর্ব ২০০০ সালে এই শহরের গোড়াপত্তন হয়। একসময় সামারখন্দ রাজধানীও ছিলো।

উজবেকিস্তানের আরেকটা মজার দিক হলো এখানকার খাবার ,মানুষজন ভোজন রসিক ও  প্রচুর মাংশ খায় ,গরু মুরগী ভেড়া ও উটের মাংশ এখানকার মানুষ প্রচুর খায় আর সাথে খায় পোলাও অনেক। এখানকার কাবাব অনেক সুস্বাধু আমি প্রতিদিনই কাবাব খেতাম কারণ এর টেস্ট ভুলার মতো নয়। 

যাই হোক আমাদের ঢাকা থেকে উজবেকিস্তানের রুটে ট্রানজিট ছিলো সৌদি আরব ,ট্রানজিট সময়ে আমরা পবিত্র মক্কা শরিফে  উমরা সম্পন্ন করি এবং বিমানে করে রওয়ানা হই,পুরো বিমানে সবাই উজবেকিস্তানের নাগরিক ছিলো শুধু আমরা ছিলাম এশিয়ান এবং ঢাকা থেকে সবজায়গায় এয়ারলাইন্ সের মানুষজন অবাক হচ্ছিলো আমরা সৌদি হয়ে উজবেকিস্তান যাবার কথা শুনে। 

যাই হোক তাশখন্দে নামি আমরা প্রায়৩ ঘন্টা বিমান জার্নির পর ,এয়ারপোর্টটি খুব বেশি বড় নয় ,ছোট বাট ছিমছাম সাজানে , সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের ও কম সময়ে আমাদের পাসপোর্টে সিল দিয়ে ভিসা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশীদের জন্য অনলাইনে ই ভিসা সুবিধা ছিলো বাট দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনলাইনে ভিসা নেবার ২দিন পরই এই সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়। যেহেতু আমাদের আগে নেয়া ছিলো তাই আটকায়নি। 

তাশখন্দ এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে গাড়ী ডেকে আমরা হোটেল এরিয়াতে চলে যাই এবং বেশ কয়েকটা হোটেল দেখে পছন্দ করে একটাতে উঠি। দুইজনের জন্য আনুমানিক বাংলাদেশী টাকায় তিন হাজার টাকা ভাড়া পড়েছিল । তাশখন্দ উজবেকিস্তানের রাজধানী এখানে আপনার মনে হবে আপনি ইউরোপে এসেছেন। মুসলিম দেশ হলেও মানুষজনকে দেখে সেটা বুঝার উপায় খুব একটা নেই। 

 

যাই হোক হোটেলের পাশেই ওখানকার জনপ্রিয় একটা রেষ্টুরেন্ট পেয়ে গেলাম ,ওখানে বিফ চিকেনের সাথে মজার একটা আইটেম ছিলো সেটা হলো ঘোড়ার মাংশ, উজবেকিস্তানের মানুষজন ঘোড়ার মাংশ খায়। জীবনে প্রথম ঘোড়ার মাংশ ট্রাই করার লোভ সামলাতে পারলাম না তবে বারকি কিউ আইটেমটাই ভালো লাগলো , এছাড়া  পিলাপ নামে একটা খাবার আছে এটা্ আমাদের বিরানীর মতো অনেকটা এটাও খুব সুস্বাধু। 

 

যাই হোক আমরা তাশখন্দ শহরটা ঘুরে দেখি , এরপর দিন আমাদের প্লান ছিলো তাজিকিস্তানের ভিসা নিবো সেজণ্য চলে যাই তাজিকিস্তানের এম্বেসীতে ,তাজিকিস্তানের ভিসা উজবেকিস্তান থেকেই নিতে হয় , ওখানে কাজ শেষ করে বিকালের মাঝেই্ আমাদের ভিসা দিয়ে দেয়। 
এ সময়ে ভিসা সেন্টারের সাথেই একটি বিয়ের অনুষ্টান হচ্ছিলো তারা আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে তাদের বিয়েতে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানায় ,আমরা ফর্মালী অংশগ্রহণ করি এবং তাদের সাথে আড্ডা দেয়া প্লাস ফলমুল গ্রহণ করি । 

 

উজবেকিস্তানের মানুষজন ফর্সা ,আবহাওয়া বা অন্জল ভিত্তিক কারণে ওখানে সবাই ফর্মা ধাচের মানুষ এবং রুচিশিল । রাতে এসে তাশখন্দের বিখ্যাত চরসু বাজার ভিজিট করি । সাথে ম্যাজিক সিটি ও বেশ কিছু ঐতিহাসিত প্লেস ভিজিট করি। 

এরপরদিন সকালে আমাদের প্লান হলো তাজিকিস্তান , সকালে গাড়ী ডেকে বর্ডারে চলে যাই সেখানে সহজে ইমিগ্রেশন শেষ করে তাজিকিস্তান পৌছে যাই এ সময়ে আমাদেরকে হেল্প করে একজন রাশিয়ান যিনি তার পার্সোনাল গাড়ী নিয়ে ঘুরতে এসেছিলো এবং সে যখন শুনেছে আমরা মুসলিম ও বাংলাদেশ থেকে এসেছি সে আমাদেরকে তার গাড়ীয় দিয়ে অনেকটা এগিয়ে দেয়। 

 

আজকে আমাদের গন্তব্য ঠিক করেছি ঐতিহাসিক খুজান্দ শহর যে শহরটি জয় করেছিলো বীর আলেকজেন্ডার। প্রাইভেট গাড়ী নিয়ে ছুটে চলে আমাদের গাড়ী , যে পথ দিয়ে যাচ্ছি এটা হলো ঐতিহাসিক সিল্ক রুট যে রুটের কথা ইতিহাসে বর্ণনা করা ছিলো ,সত্যি বলতে যে রুটের কথা আমরা বইয়ে পড়েছিলাম সে রুট ধরে চলছি ভাবতেই একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে ,পথে আমাদের ড্রাইভার ইতিহাসেন নানা বর্ণনা দিচ্ছিলো যা পুরো জার্নিটাকে উপভোগ্য করে তুলেছিলো

 

খুজান্দ শহরে এসেই হোটেল বুক করে উঠে পড়ে এবং দ্রুত ঘুরতে বের হই , এ শহরে আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেট এর নানা স্মৃতি আছে মিউজিয়াম আছে সবগুলোই ভিজিট করি ,সন্ধ্যায় চলে যাই ফল মার্কেটে ,তাজিকিস্তানে প্রচুর ফল হয় , খুজান্দের এই বাজারে এসে আমাদের চক্ষু একপ্রকাশ শীতল হয় আপেল কমলা আঙ্গুর থেকে শুরু করে এমন কোন ফল নেই এখানে হয়না , আশে পাশে সবই চাষ হয় আর অবিশ্বাস্য রকমের দাম কম যেমন বাংলাদেশে যে ফলটা ৩০০ টাকা এখানে ১০০ টাকা এমন। ভরপুর ফল খেয়ে আবার চলে আসি হোটেল। কাল সকালে গন্তব্য আমাদের রাজধানী ধুসানবে। 

 

প্রায় ৩০০ কিমি এর জার্নি সকালে শুরু করি , আমরা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এড়িয়ে প্রাইভেট কার হায়ার করি আমাদের উদ্দেশ্য হলো আস্তে আস্তে যাবো এবং পথে যত কিছু পাই সব দেখে দেখে যাবো। আকা বাকা পাহাড়ী রাস্তা ,বিশাল বিশাল পাহাড়ের মাঝখানে রাস্তা এ যেন স্বর্গীয় ব্যাপার স্যাপার । নানা জায়গায় থেমেছি ছবি তুলেছি ,রেস্ট নিয়েছি এমন করতে করতে আমরা ধুসানবে পৌছে যাই। 

বিশাল অট্রলিকার প্রিমিয়াম সিটি যেখানে ইউরোপের একটা ভাইব পাবেন , প্রথমেই গরুর মাংশ দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই তারপর একটা হোটেল দেখে হোটেলে উঠে পড়ি । 

 

ধুসানবেতে নতুন পার্লামেন্ট ভবন ,রুদারি পার্ক , মিউজিয়াম ,লাইব্রেরী সব একদিনেই আমরা ভিজিট করি এগুলো সব শহরের মধ্যেই । 

 

এরপর দিন আমাদের গন্তব্য ইসকান্দারকুল লেক , তাজিকিস্তানে আমরা যে সমস্যায় বেশি পড়েছি সেটা হলো ভাষা ,এখানকার মানুষ  নিজস্ব তাজিক ভাষা ছাড়া ইংরেজী তেমন একটা বুঝেনা।  ধুসানবের টার্মিনাল থেকে বহু কষ্টে বুঝাতে পেরেছি যে আমরা ইস্কানন্দারকুল লেক যাবো সেটা দেখে আবার বর্ডারে নামিয়ে দিতে হবে কারণ আমরা উজবেকিস্তান সমরকান্দ বর্ডার হয়ে প্রবেশ করবো। 

 

যাই হোক অবশেষে একটা প্রাইভেট গাড়ী ঠিক করে আমরা তিনজন ছুটি ইসকান্দারকুল লেকের উদ্দেশ্যে ,পাহাড়ী আকা বাকা রাস্তা পেরিয়ে পৌছে যাই ৭২০০ ফুট উচুতে অবস্থিত এই লেকে। লেকের চারপাশে পাহাড় , আর নীলাভ পানি এটাকে জাস্ট একটা অসাধারণ জায়গাতে পরিণত করেছে। যারা তাজিকিস্তান যাবেন অবশ্যই ভিজিট করতে পারেন। 

 

লেক দেখার পর আমরা আবারও ছুটি বর্ডারের উদ্দেশ্যে , পথে আপেল বাগান ও আঙ্গুর বাগানে প্রবেশ করি ,তারা বাংলাদেশী মুসলিম শুনে  অবাক হয় এবং ্ আপেল আঙ্গুল দিয়ে আপ্যায়ন করে  আবার পথে আরেকটা জিনিস পাই সেটা হলো ঘোড়ার খামার ও ঘোড়ার দুধের মাঠা ,যেহেতু এ জিনিস আর পাবোনা হয়তো কোথাও তাই আল্লাহ পাকের নাম নিয়ে ঘোড়ার দুধের মাঠা খাই ,টেস্ট বেশ ভালোই মনে হয়েছে । 

যাই হোক ইতিহাস ঐতিহ্যের দেশ তাজিকিস্তান শেষ করে উজবেকিস্তান বর্ডারে চলে আসছি আজকে প্রবেশ করবো আমরা সমরকান্দ হয়ে । সমরকান্দ উজবেকিস্তানের আরও একটি বিখ্যাত শহর। 

এখানে ইতিহাসের বিখ্যাত স্থাপনা সহ বুখারী র: সহ ইসলাম বিখ্যাত বিভিন্ন মানুষের মাজার রয়েছে। সমরকান্দে প্রবেশ করে আমরা সর্বপ্রথম বুখারী র: এর মাজারে যাই , মাজারটিতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে ,তবে বুখারী র : এর নামে আরেকটি বিখ্যাত শহর আছে যার নাম বুখারা , বুখারা শহরে উনার মাজার না হয়ে সমরকান্দে কেন হলো সেটারও একটা গল্প আছে , গুগল করে দেখে নিতে পারেন। 

যাই হোক বিশাল মাজার কমপ্লেক্স ,চমৎকার নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হতেই হয় । মাজার দেখে সমরকান্দে আরও ৪/৫ টা ঐতিহাসিক স্থাপনা আমরা দেখি যেমন আমির তৈমুর , শাহী জিন্দা ,বিবি খৈয়াম মস্ক ,রেজিস্তান স্কয়ার। অধিকাংশগুলোর নির্মাণ শৈলি প্রায় একই মনে হয়েছে আমার কাছে। 

 

যাই হোক উজবেকিস্তানে আমাদের আজকেই শেষ রাত তাই কাবাব ট্রাই করতে এখানকার একটা বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে যাই , এখানকার কাবাব খুব বিখ্যাত , এখানকার মানুষজন প্রচুর মাংশ খায়। আমরা তিনজন সেদিন বিল কত এটা ভুলে ভরপুর কাবাব ট্রাই করি। 

 

যাই হোক দুই ঐতিহ্যবাহী দেশ দেখে আমাদের এবার ফেরার পালা , অসাধারণ সব ফ্রেশ টাটকা স্মৃতি নিয়ে পরদিন সরাসরি তাশখন্দে চলে আসি এবং দেশে ফেরার প্লেন ধরি। 

 

ভ্রমণ তারিখ : সেপ্টেম্বর মাস ২০২৪ সাল  

বর্তমানে বাংলাদেশীদের জন্য সরাসরি ভিসা নেবার কোন পদ্ধতি চালু নেই মুলত কিছু বাংলাদেশী এসব দেশ হয়ে অবৈধভাবে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে যার কারণে আমাদের জণ্য ভিসা বন্ধ করে রাখা হয়েছে 

 

 

0 comments:

Post a Comment

লেখাটি শেয়ার করুন